নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।
জনমেজয় কহিলেন, ভগবন্! সত্ত্ব', ওজস্বিতা', বল, বীরত্ব ও পরাক্রমে অদ্বিতীয়, ভীষ্ম নিহত হইয়াছেন শ্রবণ করিয়া রাজা ধৃতরাষ্ট্র কি করিলেন? তাঁহার পুত্র দুর্য্যোধন ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি রথিগণের সাহায্যে মহাধনুর্দ্ধর পাণ্ডবগণকে পরাজিত করিয়া রাজ্য ভোগের অভিলাষী হইয়াছিলেন, ধনুর্দ্ধরগণের কেতুস্বরূপ সেই ভীষ্ম নিহত হইলে তিনিই বা কি করিয়াছিলেন? সমুদায় কীর্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! রাজা ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্মের মৃত্যু শ্রবণে চিন্তা ও শোকে এরূপ আকুল হইয়াছিলেন যে, কিছুতেই শান্তি লাভ করিতে না পারিয়া অনবরত সেই দুঃখই চিন্তা করিতে লাগিলেন। এমন সময় রজনী সমুপস্থিত হইল। সঞ্জয়ও শিবির হইতে হস্তিনাপুরে ধৃতরাষ্ট্র-সমীপে আগমন করিলেন। পুত্রগণের জয়ার্থ রাজা ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্মের মৃত্যুসংবাদ শ্রবণ অবধি বিষণ্ণ হৃদয় হইয়া বিলাপ করিতেছিলেন, সঞ্জয়কে প্রাপ্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, সঞ্জয়! কালপ্রেরিত কৌরবগণ ভীষণপরাক্রম মহাত্মা ভীষ্মের নিধনে শোকসাগরে মগ্ন হইয়া কি করিতে ইচ্ছা করিলেন এবং ভূপালগণই বা কি করিয়া-ছিলেন? সমুদায় কীর্ত্তন কর। মহাত্মা পাণ্ডবগণের সমুদ্ধত সেনাসকল ভুবনত্রয়েরও ভয় উৎপাদন করিতে পারে।
সঞ্জয় কহিলেন, 'হে মহারাজ! অনন্যমনে শ্রবণ করুন! সত্যপরাক্রম ভীষ্ম নিহত হইলে কৌরব ও পাণ্ডবগণ পৃথক্ পৃথক্ চিন্তা করিতে লাগিলেন। কৌরবগণ বিস্ময় ও পাণ্ডবগণ হর্ষসহকারে ক্ষত্রধর্ম অনুসারে পিতামহকে প্রণিপাত পূর্ব্বক সন্নতপর্ব্ব শরজালে তাঁহার উপাধান সমেত শয্যা প্রস্তুত করিয়া চতুর্দিকে রক্ষক নিযুক্ত করিলেন এবং পরস্পর সম্ভাষণ ও ভীষ্মের অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিয়া কাল-প্রেরিত হইয়া কোপলোহিত লোচনে পরস্পর দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক | পুনর্ব্বার যুদ্ধের নিমিত্ত গমন করিলেন। অনন্তর উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণ তুর্য্য ও ভেরীনিনাদ-সহকারে বহির্গত হইল। পরদিন প্রভাতে কৌরবগণ অমর্ষপরবশ ও কালোপহতমানস' হইয়া মহাত্মা ভীষ্মের হিতকর বাক্যে অনাদর করিয়া শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক সত্বরে গমন করিতে লাগিলেন।
মহারাজ। মৃত্যুকর্তৃক আহুত কৌরব ভূপালগণ আপনার ও দুর্য্যোধনের অজ্ঞানতায় এবং ভীষ্মের বধে শ্বাপদসঙ্কুল বলে অশরণ' অজ ও মেষসমূহের ন্যায় নিতান্ত দুৰ্ম্মনায়মান হইয়া উঠিলেন। যেমন মহার্ণবে চতুৰ্দ্দিক হইতে বায়ু প্রবাহিত হইয়া জীর্ণ নৌকাকে আহত করে, সেইরূপ মহাবীর পাণ্ডবগণ, নক্ষত্রবিহীন দ্যুলোকের' ন্যায়, বায়ুহীন আকাশের ন্যায়, শস্য-শূন্যা পৃথিবীর ন্যায়, সংস্কারহীন বাক্যের ন্যায়, বলহীন অসুর-সেনার ন্যায়, বিধবা বরবর্ণিনীয় ন্যায়, শুষ্কতোয়া তরঙ্গিণীর ন্যায়, বৃকগণকর্তৃক রুদ্ধ ও হতযুগপথ মৃগীর ন্যায় শরভকর্তৃক = হতসিংহ গিরিকন্দরের ন্যায়, ভীষ্মহীন সেই ভারতী সেনাকে নির্ভরনিপীড়িত করিয়াছিলেন। সেই সেনার অন্তর্গত অশ্ব, রথ ও গজসকল ব্যাকুল, অধিকাংশই বিপন্ন এবং সকলেই দীন ও ভীত হইয়াছিলেন; এমন কি, ভিন্ন ভিন্ন ভূপাল ও সৈনিকগণ ভীষ্ম ব্যতিরেকে যেন পাতালে নিমগ্ন হইতে লাগিলেন।
সঞ্জয় এইরূপ পুনঃ পুনঃ কর্ণের কথা কীর্তন করিতেছেন, এমন সময় ধৃতরাষ্ট্র ভুজঙ্গের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্বক সঞ্জয়কে কহিলেন, হে সঞ্জয়! দুর্য্যোধন প্রভৃতি তোমরা সকলে এক নিতান্ত কাতর ও একান্ত ত্রস্ত হইয়া যে কর্ণকে স্মরণ এবং তাঁহার সহিত যে সাক্ষাৎ করিয়াছিলে তাহা ত তিনি মিথ্যা করেন নাই? কৌরবগণের আশ্রয় ভীষ্ম নিহত হইলে তোমাদিগের যে ক্ষতি হইয়াছিল, শরীরত্যাগশীল, সত্যবিক্রম, ধনুর্দ্ধরাগ্রগণ্য কর্ণ ত তাহা পূরণ করিয়াছিলেন? তিনি শত্রুগণকে ভীত ও আমার পুত্রগণের জয়াশা সফল করিতে pপরাগমুখ হন নাই?
সঞ্জয় কহিলেন, 'মহারাজ! মহারথ ভীষ্ম নিহত হইয়াছেন শ্রবণ করিয়া মহাবীর কর্ণ অগাধ সলিলনিমগ্ন নৌকাসদৃশ কৌরব সৈন্যগণকে সহোদরের ন্যায় উদ্ধার করিবেন এবং পিতা যেমন পুত্রকে রক্ষা করেন, সেইরূপ তিনি বিপদগ্রস্ত কৌরবসেনাকে পরিত্রাণ করিবেন বলিয়া তাঁহাদিগের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, হে সৈন্যগণ! চন্দ্রমাঃ যেমন নিরন্তর শশচিহ্নে অঙ্কিত, সেইরূপ যিনি ধৃতি, বুদ্ধি, পরাক্রম, ওজস্বিতা, সত্য, দম, সমুদায় বীরগুণ, দিব্য অস্ত্র, নম্রতা, স্ত্রী, প্রিয়বাদিতা ও কৃতজ্ঞতায় নিরন্তর অলঙ্কৃত এবং দ্বিজগণের শত্রুনিপাতন সেই ভীষ্ম যদি বিনাশ প্রাপ্ত হইলেন, তবে এক্ষণে স্পষ্টই প্রতীত হইতেছে যে সমুদায় যোদ্ধাই নিহত হইয়াছেন। যখন মহাব্রত ভীষ্ম নিহত হইয়াছেন, তখন কালি যে সূর্যোদয় হইবে, ইহা কেহ নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারে না। অতএব কর্ম্মের নিয়ত সম্বন্ধনিবন্ধন' ইহলোকে কোন বস্তুই অবিনাশী নয়। বসুর ন্যায় প্রভাবসম্পন্ন ও বসুতেজে সমুৎপন্ন ভীষ্ম বসুগণকেই প্রাপ্ত হইয়াছেন; এক্ষণে ধন, পুত্র, পৃথিবী, কৌরবগণ ও এই সকল সৈন্যের নিমিত্ত শোক কর। মহাপ্রভাব ভীষ্ম নিপাতিত ও কৌরবগণ পরাজিত হইলে, কর্ণ দুৰ্ম্মনাঃ হইয়া গলদশ্রুলোচনে সাতিশয় আশ্বাস প্রদান করিতে লাগিলেন। আপনার পুত্র ও সৈনিকগণ কর্ণের বাক্য শ্রবণ করিয়া পরস্পর-চীৎকার করিতে আরম্ভ করিলেন; তাঁহাদিগের নয়ন হইতে চীৎকারের অনুরূপ শোকজল বিগলিত হইতে লাগিল।
পুনর্ব্বার মহাযুদ্ধ আরব্ধ হইলে সৈন্যগণ পার্থিবগণের নিয়োগানুসারে সিংহনাদ পরিত্যাগ করিলেন। মহারথশ্রেষ্ঠ কর্ণ আহ্লাদকর বাক্যে রথিগণকে কহিলেন, হে পার্থিবগণ! এই অনিত্য জগতে সকলেকেই নিরন্তর মৃত্যুমুখে ধাবমান হইতেছে চিন্তা করিয়া আমি সকলকেই অস্থায়ী দেখিতেছি; দেখুন! C আপনারা বিদ্যমান থাকিতেও গিরিসদৃশ কুরুপ্রধান ভীষ্ম কি প্রকারে নিপাতিত হইলেন! মহাবীর ভীষ্ম ভূতলে পাতিত হইয়া গগনপতিত দিবাকরের ন্যায় লক্ষিত হইতেছেন; প্রধান প্রধান বীরগণ নিহত হইয়াছেন; সৈন্যগণ নির্ভর নিপীড়িত হইয়াছে; শত্রুগণ তাহাদিগের উৎসাহ বিনষ্ট করিয়াছে; তাহারা একেবারে অনাথ হইয়া রহিয়াছে; এ সময়ে অন্য পাথির্বগণ ধনঞ্জয়কে সহ্য করিতে সমর্থ হইবেন না; বৃক্ষগণ কি পৰ্ব্বতবাহী সমীরণের বেগ সহ্য করিতে পারে? অতএব আমি মহাত্মা ভীষ্মের ন্যায় সমরে এই কুরু-সৈন্যকে পরিপালন করিব। এক্ষণে আমার প্রতি ঈদৃশ ভার সমর্পিত হইল; এই জগৎ অনিত্য বোধ হইতেছে এবং রণবীর ভীষ্ম নিপাতিত হইয়াছে। অতএব কি নিমিত্তই বা আমার ভয় না হইবে। সে যাহা হউক, আমি এই মহাযুদ্ধে বিচরণপূর্ব্বক পাণ্ডবগণকে শমনসদনে প্রেরণ করিয়া জগতে যশই পরম ধন এই ভাবিয়া অবস্থান করিব অথবা তাহাদিগের হস্তে প্রাণ পরিত্যাগ করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে শয়ন করিব। যুধিষ্ঠির ধৈর্য্য, বুদ্ধি, ধৰ্ম্ম ও উৎসাহ সম্পন্ন বৃকোদর শত মাতঙ্গ তুল্য বিক্রমশালী; অর্জ্জুন দেবরাজের আত্মজ ও যুবা; অতএব পাণ্ডব-সৈন্যগণকে জয় করা অমর-গণেরও অনায়াসসাধ্য নয়। যমোপম যমজ নকুল ও সহদেব । এবং সাত্যকি সমেত দেবকীসুত যে সৈন্যে আছেন, তাহা কৃতান্তের মুখস্বরূপ, কোন কাপুরুষই তাহার সম্মুখীন হইলে বিনিবৃত্ত হইতে পারিবে না; মনস্বিগণ তপস্যাদ্বারাই অত্যুগ্র তপস্যা নিবারিত করেন এবং বলদ্বারাই বলকে প্রতিহত করিয়া থাকেন।
সূত! আমার মনঃ শত্রু স্বপক্ষ-সংরক্ষণেই কৃতনিশ্চয় হইয়াছে। আজি আমি শত্রুগণের প্রভাব প্রতিহত করিয়া গমন মাত্র তাহাদিগকে পরাজয় করিব। মিত্রদ্রোহ আমার সহ্য হয় । না, সৈন্য ভগ্ন হইলে যিনি মিলিত হইবেন, তিনিই আমার মিত্র। হয়, আমি এই সৎপুরুষোচিত আর্য্য কর্মসম্পাদন করিব, না ১ হয় প্রাণ পরিত্যাগ করিয়া ভীষ্মের অনুগামী হইব; হয় সমুদায় শত্রু বিনাশ করিব, না হয় শত্রুহস্তে নিহত হইয়া বীরলোক প্রাপ্ত হইব। আমি জানি যে, স্ত্রী ও কুমারগণ ক্রন্দন ও মুক্তকণ্ঠে বিলাপ করিলে এবং ধার্তরাষ্ট্রের পৌরুষ পরাহত হইলে ঐরূপ কার্য্যই আমার কর্তব্য; অতএব আমি রাজা দুর্য্যোধনের শত্রুগণকে পরাজিত করিব, এই সুঘোর সমরে প্রাণপণে কৌরবগণের রক্ষাপূর্ব্বক সমুদায় শত্রু নিহত করিয়া দুর্য্যোধনকে রাজ্য প্রদান করিব। এক্ষণে সুবর্ণময় মণিরত্ন বিভূষিত বিচিত্র কবচ, সূর্য্যপ্রভ শিরস্ত্রাণ, অগ্নি, বিষ, ভুজঙ্গ তুল্য ধনুঃ ও শরাসন - এবং ষোড়শ তৃণীর বন্ধন করিয়া দাও; দিব্য ধনুঃ, শর, মহতী - গদা ও সুবর্ণখচিত শঙ্খ আহরণ কর; এই সুবর্ণময়ী নাগকক্ষা - ইন্দীবরপ্রভা সম্পন্ন দিব্য ধ্বজ সূক্ষ্ম বস্ত্রে মার্জিত করিয়া - জলসমবেত বিচিত্র মালার সহিত আনয়ন কর; আরও - কতকগুলি শ্বেতাভ্রসঙ্কাশ হৃষ্ট পুষ্ট অশ্ব মন্ত্রপূত জলে স্নান করাইয়া তপ্ত কাঞ্চনভূষণে ভূষিত করিয়া অনতিবিলম্বে আনয়ন কর; হেমমালা ও চন্দ্র সূর্য্যসদৃশ রত্নসমূহে বিভূষিত, সমরোচিত - উপকরণসম্পন্ন, বাহন-সংযোজিত রথ শীঘ্র আবর্তিত কর; - বেগসহ বিচিত্র চাপ, শত্রুসংহারোপযোগী উৎকৃষ্ট জ্যা, শর-- পরিপূর্ণ প্রকাণ্ড তৃণীর ও গাত্রাবরণ সকল সজ্জিত কর; প্রস্থানকালোচিত কাংস্য ও হেমঘট দধি পরিপূর্ণ করিয়া আনয়ন কর; মালা আনয়ন করিয়া অঙ্গে বন্ধন কর এবং এ জয়ভেরীসকল বাদ্য কর।
হে সূত! যে স্থানে অর্জ্জুন, বৃকোদর, যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব আছে, শীঘ্র তথায় গমন কর, আমি তাহাদিগকে সংহার করিব অথবা তাহাদের হস্তে নিহত হইয়া ভীষ্মের সহিত মিলিত হইব। যে সৈন্যে সত্যধৃতি যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জ্জুন, সাত্যকি, বাসুদেব ও সৃঞ্জয়গণ অবস্থান করিতেছে, তাহা জয় করা ভূপালগণের সাধ্যায়ও নয়। যদি সর্ব্বসংহারকর্তা কৃতান্ত অপ্রমত্ত হইয়া ধনঞ্জয়কে রক্ষা করেন, তথাপি তাহাকে বিনাশ করিব, অথবা ভীষ্মের পথ দিয়া যম-সমীপে উপস্থিত হইব। এক্ষণে আমি সেই সৈন্যগণের মধ্যে অবশ্যই গমন করিব; আমার এই সকল সহায় মিত্রদ্রোহী ভক্তিবিহীন বা পাপাত্মা নন।
অনন্তর সুবর্ণ, মুক্তা, মণি ও রত্নখচিত রথ সুসজ্জিত এবং পতাকা ও বায়ুর ন্যায় বেগবান্ অশ্বসকল সংযোজিত হইল। যেমন দেবগণ দেবরাজকে পূজা করিয়া থাকেন, সেইরূপ কুরুগণ মহাত্মা কর্ণকে সৎকার করিলেন। হুতাশনপ্রভকর্ণ অনলসদৃশ মেঘস্বন রথে আরোহণ করিয়া বিমানারূঢ় বাসবের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইলেন এবং যে স্থানে ভরতশ্রেষ্ঠ ভীষ্ম বিনাশ প্রাপ্ত হইয়াছেন, তথায় গমন করিতে লাগিলেন।
Paris is the capital of France.
Tokyo is the capital of Japan.
Tokyo is the capital of Japan.
Tokyo is the capital of Japan.
অর্জ্জুন পরাঙ্মুখ